বাওয়ালি একটি অজানা আখ্যান

লিখেছেন রোজী সিং

বাংলার জমিদার ও জমিদারি অধ্যায়টি রঙিন এবং বর্ণময়।এইসব জমিদারের মধ্যে কেউ কেউ খুব প্রজাহিতৈষী  বলে সুনামের অধিকারী কেউ আবার অত্যাচারী বলে কূখ্যাত। তাদের নানান কীর্তি ছড়িয়ে আছে বাংলার শিল্প স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যে। জমিদারি প্রথা আজ অবলুপ্ত। নেই জমিদাররা।কিন্তু কোথাও কোথাও প্রতিনিয়ত দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে পরিত্যক্ত ইমারত, সৌধ খিলান। কোথাও বা তাঁদের তৈরি জমিদারবাড়ি , অসংখ্য মন্দির, আরো কত কি! কত স্মৃতির ধ্বংসাবশেষ। আবার এদের ঘিরে প্রচলিত আছে গল্পগাথা, লোককাহিনী বা জনশ্রুতি। এগুলির কোনটির ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা মেলে কোনটির আবার মেলে না। এমনই এক না জানা কাহিনী বাওয়ালীর জমিদারদের কথা।
কলকাতার বাবুঘাট থেকে ৭৬- এ বেসরকারি বাসে সরাসরি কিংবা ডায়মন্ডহারবার গ্রামে যেকোনো বাসে আমতলায় নেমে বাওয়ালীর ট্রেকার ধরে নোদাখালি থানায় বাওয়ালি গ্রাম। ট্রেনে বজ বজ হয়েও এখানে আসা যায়।বাওয়ালীর মোড় তথা সখেরবাজার পেরিয়ে মণ্ডল পরিবারের বৃস্তিত মন্দির চত্বর, সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জীর্ণ ধ্বংসপ্রায় অনেকগুলি মন্দির, রাসমঞ্চ, বসত বাড়ি, জলটুঙ্গী, চুনঘর,নাটমন্দির, হাওয়াখানা, কৃত্রিম উদ্যানসহ ভাস্কর্য ও অলংকরণ শৈলীর অনবদ্য পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন।
 
“বাওয়ালি” নামটি  এসেছে “বাউলি” সম্প্রদায়ের নাম অনুসারে। এক সময়ে এই এলাকা ছিল সুন্দরবন অঞ্চলের অন্তর্গত। এখানে বাউলি নামে একদল মানুষ বাস করতেন । তাঁদের জীবিকা ছিল জঙ্গল থেকে কাঠ ও মধু সংগ্রহ করা।বাওয়ালি অঞ্চলের জমিদারদের আদিপুরুষ বাসুদেব রায়। তবে জমিদারি সৃষ্টি হয়েছে তাঁর পৌত্র শোভারামের সময় থেকে।
 
আঠারো শতক।বাংলায় চলেছে আউরঙ্গজেব এর নাতি নাজিম সুবাদার আজিমুশশান দেওয়ান এর কাজিয়া। সুবাদার বাংলা রাজস্ব তছনছ করছেন। সমস্ত খালিশা জমি নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের মধ্যে বিলি করে দিচ্ছিলেন। বাদশা আওরঙ্গজেব তখন দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের সঙ্গে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ব্যস্ত। অনেক অর্থের প্রয়োজন। বাংলার দেওয়ানি সামলাতে একজন দক্ষ দেওয়ান পাঠালেন-মুর্শিদকুলি খাঁ! নতুন দেওয়ান কড়া হাতে নাজিম সুবেদারের আর্থিক সন্ত্রাস রুখলেন। এতে ভয়ঙ্কর ও হিংস্র হয়ে উঠলেন সুবেদার। মুর্শিদকুলি খাঁ কে হত্যা করার চেষ্টা চলল। তিনি ঢাকা থেকে চলে এলে মুকসুদাবাদে। জায়গাটির নতুন নামকরণ হলো মুর্শিদাবাদ।এখানে এসে মুর্শিদকুলি খাঁ স্বাধীনভাবে ভূমি রাজস্বের কাজ শুরু করলেন। রাজস্ব সংগ্রহের জন্য সারা বাংলাকে তেরোটি চাকলা ও ১৬৬০ টি পরগনা ভাগ করলেন। সৃষ্টি করলেন ছোট বড় জমিদারি। তিনি বাঙালি হিন্দুদের প্রতি খুব আস্থাশীল ছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন এই সম্প্রদায়ের প্রজারা খুব শান্ত, নিরীহ , ও ভীরু। বাওয়ালি মণ্ডল পরিবারের উত্থান সেই সময় থেকে। নবাব সরকারের সুনজরে তারা পড়েন।মুর্শিদকুলি বাংলায় বিশেষত অরণ্য সংকুল অঞ্চলে মঙ্গল হাসিল করে জমিদারি স্থাপনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করেন। দক্ষিণ 24 পরগনার ভাগীরথী (আগে সরস্বতী ) বরাবর অরণ্য সংকুল অঞ্চল, যেখানে বাস করতেন সেই খানে জনবসতি স্থাপন করেন। বাওয়ালি অঞ্চলের জমিদারদের আদিপুরুষ বাসুদেব রায়। তাঁর পৌত্র শোভারামের সময় থেকে জমিদারি সৃষ্টি। শোভারাম হিজলির শাসকদের বিশেষ করে ভীম সিংয়ের খুব অনুগত ছিলেন। তাঁদের থেকে তাঁরা  ‘মণ্ডল ‘ উপাধি পান। হিজলির শাসকদের অনুগ্রহে তিনি জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। অপরদিকে মুর্শিদকুলি খাঁ ভূস্বামীদের জমিদারি সৃষ্টিতে প্রভূত উৎসাহ প্রদান করেন। এই জমিদারি প্রতিষ্ঠার জন্য বাউলি সম্প্রদায়ের প্রচুর সহযোগিতা পেয়েছিলেন বলে এই জনপদটির নাম বাওয়ালি।
 
জমিদারি থেকে আয় ছাড়াও ধান-চাল-তামাক-লবণ-মশলা প্রভৃতির ব্যবসাও ছিল।ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে তাদের কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার জন্য শ্যামগঞ্জ, গোপিগঞ্জ, মহেশ্বরপুর, চিংড়িপোতা প্রভৃতি অঞ্চলে বড় বড় আড়ত করতে পেরেছিলেন।দক্ষিণবঙ্গের লাট অঞ্চলের বেশিরভাগ জমি মণ্ডল জমিদাররা নিজেদের আওতায় নিয়ে আসে। এদের চোখধাঁধানো ঐশ্বর্য্যের জন্য বর্গী হামলা হয়েছিল বলে শোনা যায়।
 
বাওয়ালি জমিদাররা ছিলেন পরম বৈষ্ণব। কিন্তু খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যন্ত হিংস্র ও অত্যাচারী। অজস্র মন্দির যেমন তাঁরা তৈরি করেছেন তেমনি ভোগবিলাসীয় প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছেন।প্রজাদের থেকে খাজনা আদায়, গৃহে অগ্নিসংযোগ, জীবন্ত সমাধি দেওয়া, প্রজাদের গুম করে রাখা, ভয় দেখানো, গরিবদের প্রতি অসম্মান, অত্যাচার, কিছুতেই পিছপা হতেন না। নিজেদের শাসনকে প্রাধান্য দিতে বিরাট বিরাট লাঠি ও সড়কিধারী পাইক বরকন্দাজদের দল রাখতেন। অবাধ্য প্রজাদের বন্দি করে রাখা হতো চুনঘরে। আজও পাওয়া যায় অজস্র নর কঙ্কাল। মানুষের মুখে মুখে ফেরে অত্যাচারের নানা কাহিনী। নববধূকে প্রথম রাতে জমিদারবাড়িতে কাটিয়ে যেতে হতো। চোখে ধরা কোন মেয়ে জমিদারদের কুনজর থেকে বাঁচতে পারতো না। ছিল প্রজাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নানা আইন।মাথায় ছাতা আর পায়ে জুতো দিয়ে জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার ছিল সম্পূর্ণ বারণ। কাছারি থেকে তাদের প্রতি আদেশ জারি হত-“আমার নাম হুকুম, তোমার নাম তামিল। তোমাকে হুকুম দিতেছি, তুমি তাহা তামিল করো। ভবিষ্যতে কি হইবে তাহা তোমারে দেখিবার প্রয়োজন নাই।”
 
বাওয়ালীর জমিদারদের প্রধান কীর্তি হলো মন্দির প্রতিষ্ঠা।টালিগঞ্জের গঙ্গার পূর্ববর্তী অঞ্চল থেকে বাওয়ালি পর্যন্ত তাঁরা প্রচুর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এদের মধ্যে বহু মন্দির সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। কতগুলি ধ্বংসাবশেষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। এদের মধ্যে বাওয়ালীর রাধাকান্ত জিউর মন্দির টি সবথেকে প্রাচীন।দক্ষিণমুখী ত্রিখিলানযুক্ত আটচালার রাধাকান্ত মন্দির কিরে জনশ্রুতি আছে- শোভারামের পুত্র মেঘনাদ, পৌত্র রাজারাম জমিদারি পরিচালনা করলেও রাজারামের জৈষ্ঠ পৌত্র পড়ানোর সময় জমিদারির শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। মহেশ্বরপুর বাজারে হরানন্দের ধানের আড়ত ছিল। একদিন এই আড়তে আগুন লাগে। লক্ষ লক্ষ মন্ ধান পুড়তে লাগলো। হরানন্দের স্ত্রী স্বপ্নাদেশ পেলেন- ” আমি স্বয়ং তোর গৃহলক্ষী রূপে আসছি। আমার সংবর্ধনার আয়োজন কর ।” ক্রমে আগুন নিভে গেল আর কি আশ্চর্য! সেই আগুনের নেভা ছাইএর মধ্যে লক্ষ লক্ষ মন কাঁচ। মহাজনরা এসে সেই কাঁচ কিনে নিয়ে গেল। সেই কাঁচ বিক্রি করে বিপুল অর্থ রোজগার করলেন হরানন্দ। খুললেন অতিথিশালা। একদিন সেই অতিথিশালায় এলেন এক সন্ন্যাসী ঠাকুর। হরানন্দ কে তিনি একটি বিগ্রহ দিতে চাইলেন।তিনি বললেন বিগ্রহটি তিনি দেবেন পরের দিন। সেই রাতেই হরানন্দ আবার স্বপ্নাদিষ্ট হলেন ।পরেরদিন সন্ন্যাসী ঠাকুরের কাছে তিনি এগিয়ে বিগ্রহ প্রার্থনা করলেন  সন্ন্যাসী তাঁকে দান করলেন লক্ষ্মী জনার্দন মূর্তি।১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে (১১৭৮ বঙ্গাব্দ) বুল চন্দ্র মিস্ত্রির সহায়তায় নির্মাণ করলেন মন্দির।
 
 
 
আগে সেখানে স্থাপন করলেন আগের শিলা মুর্তি। পরে রাধাকান্ত দেবের বিগ্রহ স্থাপন করলেন। মূর্তির বামপাশে অষ্ট ধাতু নির্মিত রাধারানীর মূর্তি ও স্থাপন করলেন। মঙ্গল জমিদার বংশ এটি প্রথম দেব কীর্তি, স্বাভাবিকভাবেই প্রাচীন। মন্দির উপলক্ষে তখনকার দিনে খরচ হয় এক লক্ষ টাকা।
কিন্তু সে ছিল যুগসন্ধিক্ষণ। ইতিহাস আজ সাক্ষী সেই ভয়ঙ্কর সময় কালের। উপনিবেশিক শক্তি তখন ধীরে ধীরে বাংলাকে গ্রাস করেছে। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) বাংলায় ঘটেছে মর্মান্তিক মন্বন্তর যার বিভীষিকাময় প্রত্যক্ষ করেছে বাংলার মানুষ। সমকালীন বাংলার তিন কোটি মানুষের মধ্যে এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল অনাহারে। বলা বাহুল্য,কৃষক সমাজের অর্ধেক লোক মারা যায় মন্বন্তরে এবং মন্দির নির্মাণের জন্য বাঙালির জমিদারদের অত্যাচার চালিয়ে প্রজাদের থেকে খাজনা উসুল করে।
যাইহোক, এককালে এই মন্দিরটি টেরাকোটা অলংকারে সৌন্দর্যমন্ডিত ছিল। তার কিছু কিছু নিদর্শন আজও মেলে।৭০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মন্দিরের সামনে নাটমন্ডল আটকোনা রাসমঞ্চ। নাট মণ্ডপে আয়নিক স্তম্ভের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। পাশেই গোপিনাথের দক্ষিণমুখী তিনদিকে অলিন্দ যুদ্ধ সুবৃহৎ নবরত্ন মন্দির।(১২০১ বঙ্গাব্দ/১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দ স্থাপনকাল) উচ্চতা ৭০ ফুট। মন্দিরটির কেন্দ্রীয় বৃহত্তম রত্নটি পীড়া রীতির বাকি আটটি রত্ন ত্রিরথ রেখা শৈলীর আদলে তৈরি।এরই অনুকরণে ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে রামনাথ মন্ডল টালিগঞ্জ মন্ডললেনে মন্ডল বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ নবরত্ন রাধা বল্লবের মন্দির কে তৈরি করেন।
 
পুরানন্দ বাবুর ভাই বিষ্ণুচরন। তিনি রাজরাজেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্দির আজ আর নেই। রামনাথ মন্ডল প্রচলন করেন ঝুলন যাত্রার। তিনি একটি পুষ্পক রথও  নির্মাণ করেন। খিলানের উপস্থাপন করা ঝুলন বাটির কারুকার্য ও নির্মাণ পরিপাট ছিল অপূর্ব। মানিক চন্দ্র মন্ডল রথ ও স্নানযাত্রার প্রচলন করেন।১২১৬ সালে একটি ১৩ তলা রথ নির্মাণ করা হয়। সেটি উচ্চতা, কারুকার্য ও মূল্যে ছিল অদ্বিতীয়। রথ যেখানে থাকবে স্বাভাবিক ভাবেই তাকে রথতলা বলা হয়। হরানন্দ প্রতিষ্ঠিত লক্ষ্মী জনার্দন মূর্তি রথে বসিয়ে রথতলায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেই ১৩ তলা রথ আজ নেই কিন্তু প্রথাটি বহমান।১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দ/ ১২০১ বঙ্গাব্দে মানিক মণ্ডল তৈরি করেন গোপীনাথ জিউর মন্দির। মন্দিরের গায়ে টেরাকোটা ও পঙ্খ কাজের অলংকরণ। গোপীনাথ জিউর মন্দিরটি দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির অপেক্ষা উঁচু। সাদাকালো ইতালিয়ান পাথরে সংমিশ্রণে মন্দিরটির মেঝে নির্মিত।বিরাট স্থাপত্য কে কেন্দ্র করে বৈভব প্রদর্শনই ছিল জমিদারদের একমাত্র ইচ্ছা। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলায় স্থাপত্য ইউরোপীয় প্রভাব চোখে পড়ে। স্তম্ভ নির্মাণের ভোরিক, আয়নিক, কারিয়ন্থিয়াসও অলংকরণ এক্ষেত্রে ফ্যান লাইট ও ফেস্টুন পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়।দোলমঞ্চ, নাটমঞ্চ, দিঘির ওপর জলটুঙ্গীর বাগান ও ইমারত নির্মাণে ইউরোপীয় শিল্পরীতির প্রভাব চোখে পড়ে। একদিন এই মন্দির, রাসমঞ্চ ঘিরে ধুমধাম করে মেলা বসতো। মেলা চলত অনেকদিন। আনন্দ-উৎসবে মেতে থাকত এলাকার মানুষ।বর্তমানে এই সব জমিতে এমনভাবে জনবসতি গড়ে উঠেছে যে রাসমঞ্চটি কবে যেন সকলের অলক্ষ্যে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছে। হেরিটেজ তকমা পাওয়া সত্ত্বেও এগুলিতে সংস্কারের অভাবে লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া আশেপাশে প্রচুর নির্মাণকাজ হাওয়ায় ভেঙে পড়তে থাকে ২০০ বছরের প্রাচীন স্থাপত্য কীর্তি টি। বিস্মৃত হতে থাকে মণ্ডল পরিবারের রুচিও শিল্পবোধ। বর্তমানে রথের মেলা ও সুন্দর অনুপম সাজে হয় গোষ্ঠ মেলা। সেই সময়ে বিগ্রহের সাজ মন ভরিয়ে দেয়।
 
একটি ব্যাপার অনস্বীকার্য।মন্দির প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাহবালির জমিদারের ছিলেন অগ্রণী আর তাদের নবরত্ন মন্দির ধারাবাহিকতা বজায় ছিল উনিশ শতকেও। গঙ্গা মোহন মন্ডলের সময় থেকে জমিদারির আয় বহু পরিমাণ বেড়ে যায়।টালিগঞ্জের আদি গঙ্গার তীরে তারপুত্র প্যারিলাল মন্ডল বহু মন্দির নির্মাণ করেন। তিনি হরিহর ধাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উদয়নারায়ন মন্ডল নির্মাণ করেন এ রাধা মদনমোহন জিউর মন্দির।হরানন্দ বাবুর তৃতীয় পুত্র কৃষ্ণমণ্ডল কাজবাগানে রাধাবল্লব ঠাকুর জিউর মন্দির নির্মাণ করেন। অপর পুত্র গোপাল চন্দ্র মন্ডল পাঁচবাটির কাছে শিলা প্রতিষ্ঠা করেন।রাধাচরণ মন্ডলের পুত্রবধূ ভগবতী দেবী গোপাল জিউর মন্দির স্থাপন করেন।বৃন্দাবন মন্ডলের ছোট ছেলে রঘুনাথ মন্ডল রাজা গোপীনাথ জিউর মন্দির তৈরি করেন।জমিদার মানিক মণ্ডলের পঞ্চম পুত্র নারায়ন বাবু মহেশ্বরপুর গোপীনাথ জিউর মন্দির প্রতিষ্ঠা করার কাজ শুরু করেন। কিন্তু কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।শ্বশুরমশাইয়ের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন পুত্রবধূ রমণী দেবী । কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে তিনিও সেই কাজ শেষ করতে পারেননি ( এঁর কন্যা প্রচন্ড মেয়ের বিয়ে হয় রানী রাসমনির জামাতা মথুরামোহন বিশ্বাসের বড় ছেলে ভূপাল চন্দ্রের সাথে। এঁদের বড় ছেলে শশীভূষণ বিশ্বাস)।
 
শিক্ষা সংস্কৃতি বা কোন জনহিতকর কাজে বাবার জমিদারি কোন অবদান খুঁজে পাওয়া যায় না। প্যারীলাল মন্ডল খানিক গান সহায়তা করতেন যদিও তিনি কবি বিলাসী ছিলেন। আর জমিদার রাজকিশোর মন্ডল একটি সংস্কৃত গ্রন্থ প্রকাশে সহযোগিতা করেছিলেন।ভর্তি হরি সংস্কৃত ব্যাকরণ ব্যাকরণ কে কাব্যে রূপদান করে তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন।নদীয়ার মহেশপুরের বাসিন্দা মহাপণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ সরস্বতীর ” অন্তব্যাকরণ্য ” পরিশিষ্ট নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন যিনি জমিদার রাজকিশোর ১৩০১বঙ্গাব্দের১২ই আষাঢ় সকল ব্যয়ভার বহন করে গ্রন্থটি প্রকাশ করেন।
 
গথিক স্থাপত্য রীতি মেনে তৈরি অসামান্য সুন্দর বাওয়ালি রাজবাড়ী, যা স্থাপন করেন জমিদার উদয়নারায়ন মন্ডল।দোতালা চকমিলান ইউরোপীয় শৈলীতে অনুপম সৌন্দর্যে প্রতিচ্ছবি যেন এই প্রাসাদ। আয়নিক পিলার, পেডিমেন্ট, ফ্যান লাইট, ফেস্টুনের ব্যবহার বাড়ি থেকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।দুদিক থেকে একজোড়া টাস্ককানের মধ্যে চারটি আয়নিক পিলার বহন করে চলেছে একটি বিশাল পেডিমেন্ট কে। বাড়ির একতলায় অর্ধচন্দ্রাকার খিলান ও দ্বিতীয় তলায় সারি সারি আয়নিক স্তম্ভ। এখন যদিও এটি আর মণ্ডল পরিবারের হাতে নেই।এক অবাঙালি শিল্পপতি এটি কিনে নিয়েছেন এবং সংস্কার করে পরিণত করেছেন বিলাসবহুল বিনোদনভবনে।
 
এখানকার সাধারণ মানুষের কথাই বারবার উঠে এসেছে জমিদারদের বিলাসিতার কথা। এরই এক জ্বলন্ত উদাহরণ জলটুঙ্গী। এক অনুপম স্থাপত্য। এই জল টুঙ্গি নির্মাণে শিল্পরীতি পরিচয় মেলে। এই ধরনের স্থাপত্য বাংলায় খুব একটা দেখা যায়না। জল টুঙ্গি এক ধরনের ঘর যা জল অর্থাৎ দিঘী বা পুকুরের মধ্যে তৈরি। জলে প্রস্ফুটিত পদ্মফুল আর শীতল বাতাস মন জুড়িয়ে দিত। পদ্ম ফুলের সৌরভে সুরভিত থাকত চারিধার। জমিদারদের বিনোদনের জায়গা ছিল এটি।নিত্যনতুন মেয়ে মানুষ নিয়ে মদে চুর হয়ে সারারাত নাচ-গান ফুর্তিতে মেতে থাকতেন তারা। বাইরে থাকত কড়া পাহারা। লাঠি সড়কী ধারী বেহারী দরওয়ান।জলটুঙ্গি আজব স্থির দাঁড়িয়ে লাম্পট্য আর অত্যাচারের স্মৃতিবহন করে নিয়ে চলেছে। নেই সেই কুমুদরাশি বা তাদের সৌরভ। চতুর্দিকে আগাছায় পরিপূর্ণ।তারই মধ্যে একাকী নির্জনে স্থবির এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে জল টুঙ্গি। বর্তমানে সংরক্ষণের কথা ভাবা হয়েছে।
 
 কালচক্র প্রবর্তিত হতে থাকে। শতক আসে শতক যায়। এই চক্রের অতলে নিমজ্জিত হয়ে যায় একে একে সব। বা বালির বহু মন্দির, কাচারিঘর, সৌধ ধ্বংসের মুখে। বেশ কয়েক বছর আগে কুমুদ মন্ডলের বাগানবাড়িতে ধ্বংস করা হলো।আজও হাতছানি দেয় রাসমঞ্চ, দোলমঞ্চ, মন্দির, বাগানবাড়ি, চাঁদনী, জল টুঙ্গি ও উদ্যান।জমিদারবাড়ি ও কাছারির সামনে বহু ইউরোপীয় নারীর মুখের আদলে দাঁড়িয়ে থাকা নগ্ন-অর্ধনগ্ন স্টাকর ভগ্নাবশেষ যা মনে করিয়ে দেয় অতীতের কথা, সদ্য স্নাত লজ্জা বস না স্থলিত বসনা মূর্তি গুলির মুখশ্রীতে ঘটেছে হেলনীয় শিল্পরীতির সংমিশ্রন। চারিদিকে ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের সমাহার।সৌন্দর্যের সুষমা, ঝাড়বাতির মোলায়েম আলো, সবুজের হাতছানি, বারবার পুরাতন বাংলার এক অজানা অধ্যায়কে আজও আলোকিত করে এই ভাবেই।।
 
 
ঋণ স্বীকার : বাওয়ালি ও বাঙালির জমিদারদের কথা মনন মুখোপাধ্যায়
error: No No No!! Cannot right click